নিজস্ব প্রতিবেদক: পাকিস্তানের করাচি বন্দরের সঙ্গে চট্টগ্রামের সরাসরি কনটেইনার জাহাজ যোগাযোগ চালু হয়েছে গত সপ্তাহে। প্রথমবার নতুন এই পরিবহনসেবায় পাকিস্তানের করাচি বন্দর থেকে জাহাজে করে সরাসরি কনটেইনারে পণ্য আনা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। এই সেবা চালুর আগে পাকিস্তানের কনটেইনার পণ্য তৃতীয় দেশ হয়ে চট্টগ্রামে আনা হতো।
প্রথমবার এই সেবায় ‘এমভি ইউয়ান জিয়ান ফা ঝং’ জাহাজে করে পাকিস্তান থেকে কনটেইনারে কী পণ্য আনা হয়েছে, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। ছড়ানো হচ্ছে প্রোপাগান্ডা।
পাকিস্তান থেকে আসা কনটেইনার তল্লাশি করতে চাওয়ায় চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্মকর্তা ওয়ালিদ হোসেন এবং মো. রাসেলকে বদলি করার একটি অসত্য তথ্য সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ‘ডিফেন্স পাকিস্তান’ নামে একটি এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে পাকিস্তান বাংলাদেশে অস্ত্র পাঠানোর খবর প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো সূত্র বলা হয়নি। আর ঐ তথ্যটি চলতি বছরের ২৯ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছিল। অথচ করাচি থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের মালামাল এসেছে গত ১১ নভেম্বর।
মূলত আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী ফেসবুক পেজগুলো ড. ইউনূস সরকার বিশেষ করে তার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত মিথ্যা প্রচারণা শুরু করেছে, এসব অসত্য তথ্য ছড়াচ্ছে।
যা ছড়ানো হচ্ছে-
পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি কনটেইনার যোগাযোগের আড়ালে অস্ত্র আমদানি করে বাংলাদেশ এবং ভারতকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। কিছু কিছু পোস্টে এমনও দাবি করা হচ্ছে যে, পাকিস্তান থেকে যেসব পণ্য আসবে তা কোনো ধরনের চেক করার সুযোগ পাবে না বাংলাদেশের কাস্টমস। আর এগুলো সরাসরি ভারতে চলে যাবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে যাওয়ার আগে জাহাজটি থেকে ৩৭০ একক কনটেইনার নামানো হয় বন্দরে। এর মধ্যে পাকিস্তানের করাচি বন্দর থেকে আনা হয়েছে ২৯৭ একক কনটেইনার। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আনা হয়েছে ৭৩ একক কনটেইনার।
পাকিস্তান থেকে সেই জাহাজে যা যা এল-
শিপিং ও কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, পাকিস্তান থেকে আমদানি হওয়া কনটেইনারে রয়েছে শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য। এসব পণ্যের ওজন ছয় হাজার ৩৩৭ টন। পাকিস্তানের ১৮টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এসব পণ্য সরবরাহ করেছে।
তালিকা অনুযায়ী, পাকিস্তান থেকে জাহাজটিতে করে সবচেয়ে বেশি আনা হয়েছে সোডিয়াম কার্বনেট বা সোডা অ্যাশ। টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় এটি। মোট ১১৫ কনটেইনারে রয়েছে সোডা অ্যাশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমদানি পণ্য হলো খনিজ পদার্থ ডলোমাইট। ডলোমাইট রয়েছে ৪৬ কনটেইনারে। মোট ৩৫ একক কনটেইনারে আনা হয়েছে চুনাপাথর। ম্যাগনেশিয়াম কার্বোনেট আনা হয়েছে ছয় কনটেইনারে।
এছাড়া কাচশিল্পের কাঁচামাল ভাঙা কাচ আনা হয়েছে ১০ কনটেইনারে। শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের কাঁচামাল কাপড়, রং ইত্যাদি রয়েছে ২৮ কনটেইনারে। একটি কনটেইনারে রয়েছে গাড়ির যন্ত্রাংশ। এসব পণ্য আমদানি করেছে আকিজ গ্লাস কারখানা, নাসির ফ্লোট গ্লাস, প্যাসিফিক জিনস, এক্স সিরামিকস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
শিল্পের কাঁচামাল ছাড়াও পেঁয়াজ আনা হয়েছে ৪২ একক কনটেইনারে। এসব কনটেইনারে পেঁয়াজ রয়েছে ৬১১ টন। এর বাইরে ১৪ একক কনটেইনারে আলু আমদানি হয়েছে ২০৩ টন। এই দুটো পণ্য আনা হয়েছে হিমায়িত কনটেইনারে। ঢাকার হাফিজ করপোরেশন, এম আর ট্রেডিংস ও চট্টগ্রামের আল্লাহর রহমত স্টোর পেঁয়াজ-আলু এনেছে।
একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে দীর্ঘসময় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্য হতো না। পরবর্তী সময়ে আবারো পাকিস্তানে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও দেশটি থেকে সাধারণত সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রামে আসতো না। প্রথমে শ্রীলংকায় কনটেইনার খালাস করতো পাকিস্তানের জাহাজ, এরপর অন্য জাহাজে শ্রীলংকা থেকে সেসব কনটেইনার বাংলাদেশে আসতো।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনার শাসনামলে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শীতল থাকলেও ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটির সঙ্গে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম সীমিত হতে থাকে। একপর্যায়ে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে দেশটি থেকে আমদানি করা অধিকাংশ পণ্য ‘লাল তালিকাভুক্ত’ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। গত আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পাকিস্তানের অনুরোধে গত ২৯ সেপ্টেম্বর দেশটির সব ধরনের পণ্য ‘লাল তালিকা’ থেকে মুক্ত হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নে নানা তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে।
সরাসরি পণ্য এলে কী হবে
করাচি থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের দূরত্ব প্রায় দুই হাজার ৬১২ নটিক্যাল মাইল। কিন্তু একটি জাহাজে যত কনটেইনার বহন করা হয়, তত কনটেইনার করাচি থেকে বাংলাদেশে আসে না। ফলে নতুন সেবা চালু করা প্রতিষ্ঠান দুবাইভিত্তিক কন্টেইনার বহনকারী কোম্পানি আরো কয়েকটি দেশের বন্দরকে এর সাথে যুক্ত করেছে।
এসব জাহাজ দুবাই থেকে পাকিস্তানের করাচি হয়ে, ভারতের মুন্দ্র হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে আসবে। আবার এখান থেকে মালয়েশিয়ার কেলাং এবং ইন্দোনেশিয়ার বেলাওয়ানে চলে যাবে। এর ফলে আগে তৃতীয় দেশ হয়ে পণ্য আনা-নেয়ায় যে বাড়তি খরচ হতো ও অতিরিক্ত সময় লাগতো, সেটা আর লাগবে না।
তেমনই একজন হলেন সৌম্য সামু। তিনি বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ ছিল না। এটি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের একটি বড় সমস্যা ছিল। পণ্য আমদানি বা রফতানি করার ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যেত এবং আরেকটি বড় সমস্যা ছিল সময়।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে পণ্য পাঠাতে বা পাকিস্তান থেকে পণ্য আনতে ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগতো। কখনো কখনো এমনও হতো যে সময় মতো পণ্য পৌঁছাতে পারতো না। যেমন কোনো এক ঈদের সময় পাকিস্তান থেকে অর্ডার করা পণ্য সময় মতো আসেনি।’
এখন এই পণ্যবাহী জাহাজের মাধ্যমে পণ্য ১০ দিনের মাঝে বাংলাদেশে পৌঁছে যাবে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘যদি এভাবে সামুদ্রিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়, তাহলে আমি পাকিস্তান থেকে আরো পণ্য অর্ডার করব। আমি আমার পাকিস্তানি ব্যবসায়ী বন্ধুদেরও জানিয়েছি।’
বাংলাদেশের গার্মেন্ট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী সৈয়দ নবীদ শাহ বলেন, ‘বাংলাদেশের পাকিস্তানের অনেক পণ্যের প্রয়োজন হয়। এই পণ্যগুলো আগে অন্য রুট দিয়ে আসতো। সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ না থাকায় পাকিস্তান থেকে পণ্য আসতে সময় লাগতো। এতে উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হতো। এখন করাচি থেকে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ১০ দিনের মধ্যেই পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে।’
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএমওএ) সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘এভাবে পণ্য আসাটা বাংলাদেশের জন্য ভালো। এখানে খারাপ কিছু নেই। আমরা যদি সস্তায় মালামাল পাই, তাহলে তো ভালোই। যেকোনো দেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হলে সবচেয়ে সস্তা প্রক্রিয়া। অন্য দেশ হয়ে এলে সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আরো কয়েকটি বন্দর ঘোরা মানে প্রতিদিনের জন্য টাকা গোনা।’
পাকিস্তানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ১৭ হাজার কনটেইনার এসেছে। আর এ বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ১৬ হাজার কনটেইনার পাঠানো হয়েছে। তবে এই আমদানি-রফতানি সরাসরি না হয়ে শ্রীলংকা বা দুবাইয়ের মাধ্যমে চলছিল।