শুক্রবার | ৯ জানুয়ারি, ২০২৬ | ২৫ পৌষ, ১৪৩২

৫৪ বছরে ৯ ভিপি পেয়েছে জাবি, একজন হত্যাকাণ্ডের শিকার

জাবি প্রতিবেদক: দীর্ঘ ৩৩ বছর পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন। পরপর দুইবার তফসিল ঘোষণা করার পর আগামী ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই নির্বাচন। এরইমধ্যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন শিক্ষার্থীরা। সৎ, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক ছাত্র নেতৃত্ব তৈরির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই ছাত্র সংসদের যাত্রা শুরু ১৯৭২ সাল থেকে।
১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি)। প্রতিষ্ঠার পর যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু হয় জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। ১৯৭২ সালে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রথম সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন গোলাম মোর্শেদ। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন রোকনউদ্দিন।
পরবর্তী ৭৩, ৭৪, ৮০, ৮১, ৮৯, ৯০, ৯১ ও ৯২ সালসহ মোট ৯ বার জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৩ সালের জাকসু নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন রফিকউল্লাহ। জিএস হন মোজাম্মেল হক। পালাক্রমে ১৯৭৪ সালের ভিপি হন এম এ জলিল ও জিএস দোলোয়ার হোসেন। এরপর ৮০, ৮১, ৮৯, ৯০ ও ৯১ সালে যথাক্রমে ভিপি নির্বাচিত হন আজাদ রহমান, মোতাহার হোসেন, এ কে এম এনামুল হক শামীম, আশরাফ উদ্দিন খান ও মনিরুজ্জামান মনির। জিএস পদে ছিলেন আতাউর রহমান, সামসুদ্দিন মাসুদ, আজিজুল হাসান চৌধুরী, আজগর হোসেন ও কে এম রাশেদুল হাসান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক ছাত্রের বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে ১৯৯৩ সালের ২৯ জুলাই ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে সংঘর্ষ হলে জাকসু ও হল সংসদ বাতিল করে তৎকালীন প্রশাসন। তখন থেকে দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের দাবি ও ধারাবাহিক আন্দোলনের পরও বন্ধ রয়েছে জাকসু নির্বাচন।
প্রথম দিকে জাকসু ও হল হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে এলেও এর রয়েছে এক কালো অধ্যায়। ১৯৭৩ সালে জাকসুর প্রথম সাধারণ সম্পাদক জাসদ নেতা শাহ বোরহান উদ্দিন রোকন খুন হন নারায়ণগঞ্জে। জাকসুর সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়। এর পরের বছরই ১৯৭৪ সালে জাকসুর দ্বিতীয় সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হকও নিহত হন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের হাতে। এই দুজনকেই দাফন করা হয় জাবি ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাসের ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণাগারের পাশেই রয়েছে তাদের কবর। এছাড়া জাবি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন সাত শিক্ষার্থী। যাদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩-এর ১৯ (২) ধারা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্যানেল নির্বাচনে জাকসু থেকে পাঁচজন নির্বাচিত প্রতিনিধির ভোটাধিকার আছে; কিন্তু বর্তমানে জাকসু সচল না থাকায় উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বও সম্ভব হচ্ছে না। জাকসু নির্বাচন দাবিতে বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, আলোচনাসভা, স্মারকলিপিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। তবে তা আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
২০১৩ সালে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের সময় জাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে শেষ পর্যন্ত হয়নি জাকসু নির্বাচন।
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড কামরুল আহসান গত ১ মে জাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। তফসিল অনুযায়ী, ৩১ জুলাই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও জুলাই আন্দোলনের বিচার সম্পূর্ণ না হওয়ায় তা পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তী সময়ে জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব ও প্রক্টর অধ্যাপক একেএম রাশিদুল আলম নেতৃত্বে নতুন করে পুনরায় জাকসুর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। সে অনুযায়ী আগামী ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে জাকসু নির্বাচন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচনে ২৫ পদের বিপরীতে ২৭৩ জন মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া হল সংসদ নির্বাচনে ২১টি আবাসিক হলে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ৪৬৭ জন।
জাকসু নির্বাচনের সার্বিক বিষয় নিয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, ‌‘জাকসু নির্বাচন শুধু শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি তৈরি করবে না, সুষ্ঠু নির্বাচনের চর্চাক্ষেত্র গড়ে তুলবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগ্য ও নেতৃত্বের গুণাবলী ফুটে উঠবে। প্রশাসনের সহায়তায়, শিক্ষার্থীরা ধর্ম-বর্ণ উপেক্ষা করে যোগ্য ও নেতৃত্বর গুণাবলী দেখে তাদের প্রতিনিধি নির্ধারণ করবেন। দীর্ঘদির ধরে এটার সবার প্রত্যাশা।’
গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ জাবি শাখা সমর্থিত প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, ‘আসন্ন জাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের বহুল প্রত্যাশিত আকাঙ্ক্ষা। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়ে উঠবে এই নির্বাচনের মাধ্যমে। আমরা আশাবাদী, আগামী ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দেবে।’
শাখা শিবিরের সভাপতি মহিবুর রহমান মুহিব বলেন, ‌‌‘সুনির্দিষ্ট প্রতিনিধি না থাকায় বহুদিন ধরে শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হয়েছেন। সিনেটের সব বৈঠকে শিক্ষার্থীদের পাঁচজন প্রতিনিধি থাকার নিয়ম রয়েছে। সেখান থেকে আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে বহু দিন নির্বাচন না দিয়ে। আমরা আশা করি, জাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার আদায়ে সরব হয়ে উঠবে।’

© 2026 republicdhaka.com | About us | Privacy Policy | Terms & Condidtion
Developed by- SHUMANBD.COM