শনিবার | ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ | ৩ মাঘ, ১৪৩২

রিকশাসহ ছোট যানবাহন চলাচলে নীতিমালা চায় যাত্রী কল্যাণ সমিতি

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে ৪০ লাখ অটোরিকশা নিবন্ধন ও নামমাত্র ফি নিয়ে চালককে লাইসেন্স দেওয়া হলে বছরে ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতে পারে বলে দাবি করছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) জরুরিভিত্তিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ছোট যানবাহন চলাচল নীতিমালা প্রণয়নের দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি করেন সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

তিনি বলেন, ২০১৬ সাল থেকে দেশে অটোরিকশা বিস্তার লাভ করলে যাত্রী কল্যাণ সমিতি এই খাত নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি নানা ফোরামে প্রস্তাব তুলে ধরে। বিগত সময়ে সারাদেশে ৪০ লাখ অটোরিকশা থেকে দৈনিক ১১০ কোটি টাকা হিসেবে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে চাঁদাবাজি হয়েছে। এই চাঁদাবাজির কারণে রাজধানীর প্রধান সড়কসহ দেশের সব সড়ক-মহাসড়ক, নগর-বন্দরে অটোরিকশা দৌরাত্ম্য বেড়ে চরম আকার ধারণ করেছে। আওয়ামী লীগের অনেক এমপি-মন্ত্রী এই চাঁদাবাজিতে যুক্ত ছিলেন, তাই এই খাত নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, অবাধে আমদানি ও স্থানীয় গ্যারেজে সহজে তৈরি করে রাস্তায় নামানোর অবাধে সুযোগ থাকায় স্বল্প পুঁজিতে লাখ লাখ মানুষ অটোরিকশা কিনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছে। এসব যানবাহন প্রশিক্ষণবিহীন মানুষের হাতে যাওয়ার কারণে সড়ক নিরাপত্তায় ভয়ানক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

দেশের হাসপাতালগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী ভর্তির চিত্র পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা, থ্রি-হুইলার, ইজিবাইক বৃদ্ধির কারণে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ভয়াবহভাবে বাড়ছে। ২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গু হাসপাতালে ১৪ হাজার ৩৫৭ জন, চমেক হাসপাতালে ৯ হাজার ৮৭৯ জন, কুমেক হাসপাতালে ৬ হাজার ৭৪৮ জন, খুমেক হাসপাতালে ৯ হাজার ২৯৩ জন, ঢামেক হাসপাতালে ৪ হাজার ৭৮৪ জন, নারায়ণগঞ্জের খাঁনপুর হাসপাতালে ৪ হাজার ৫৮৩ জন, পিজি হাসপাতালে ৩ হাজার ৫৬৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এছাড়া ৬৪টি জেলা সদর হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১৭ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে। সরকার নিবন্ধিত ৪ হাজার বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে। সারাদেশের এমন ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র মোটরসাইকেলের বাণিজ্যিক ব্যবহার, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বৃদ্ধির কারণে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত ৫ আগস্টের পর থেকে এসব অটোরিকশা আরো বেপরোয়া হয়ে রাজধানীসহ দেশের প্রধান প্রধান সড়ক-মহাসড়কে অবাধে চলাচল শুরু করে। এতে সড়ক দুর্ঘটনা ও যানজট চরম আকার ধারন করে। ফলে নতুন সরকার রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশাসহ অযান্ত্রিক যানবাহন উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়। এ পরিস্থিতিতে গত ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট ৩ দিনের মধ্যে ঢাকা মহানগরীর সড়কে অটোরিকশা চলাচল বন্ধ বা বিধি-নিষেধ আরোপ করার নির্দেশ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন অটোরিকশা উচ্ছেদ করতে গেলে পুরো রাজধানীর লাখ লাখ অটোরিকশার চালক ও মালিক সংগঠিত হয়ে সড়কপথ, রেলপথে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, সরকার ২০২১ সালে ‘থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় মোটরযানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা-২০২১’ নামে একটি খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করে। অথচ করোনা সংক্রমণে গণপরিবহন বন্ধ থাকার সুবাধে ২০২১-২০২২ সালে প্রায় ১৬ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ২০ লাখ মোটরসাইকেল রাস্তায় নামে। সারাদেশে এসব যানবাহনের কারণে সৃষ্ট যানজট ও দুর্ঘটনা দ্বিগুণ হলেও অদৃশ্য কারণে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় নীতিমালাটি চূড়ান্ত করেনি। জরুরি ভিত্তিতে এই নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

অটোরিকশা নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে যাত্রী কল্যাণ সমিতির ৮ সুপারিশ-
১. জরুরি ভিত্তিতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতি, শ্রমিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় প্রণীত ‘থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় মোটরযানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা’র খসড়া চূড়ান্ত করে গেজেট আকারে প্রকাশ করতে হবে।

২. বুয়েট, চুয়েট, রুয়েট ও সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশার বডি মডিফাই করে ব্রেক ও গতির সমতা এনে সড়ক নিরাপত্তায় ঝুঁকিমুক্ত নিশ্চিত করে সার্টিফাইসহ নিবন্ধন নিতে হবে।

৩. সড়কের সক্ষমতা বিবেচনায় সিলিং নির্ধারণ করে দেশের সব সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে, বিআরটিএ-এর নিয়ন্ত্রণে আওতাধীন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন প্রদান করতে হবে।

৪. প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশার চালককে নূন্যতম ১ সপ্তাহের সড়ক আইন-কানুন, ট্রাফিক চিহ্ন, সড়কে মোটর রিকশা চলাচল পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। প্রশিক্ষণ সমাপ্তকারীদের নামমাত্র ফি নিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোর ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করতে হবে। হুট করে গ্রাম থেকে এসে প্রশিক্ষণহীন কোনো ব্যক্তি যেন ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।

৫. প্রতিটি ব্যাটরিচালিত রিকশায় ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে জিপিএস লাগানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। জিপিএস ট্যাকিং এর মাধ্যমে গতি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। রাজধানীর প্রধান সড়ক, দেশের হাইওয়ে বা উপজেলা ও পৌরসভার প্রধান সড়কের যেটুকু অংশ সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে সেই সড়কে প্রবেশ করামাত্র জিপিএস-এর মাধ্যমে ট্রাফিক বিভাগ অটো জরিমানা আদায় করতে পারবে এমন পন্থায় তাদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।

৬. ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা জাতীয় মহাসড়কে চলাচল কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। রাজধানীসহ দেশের শহরগুলোর প্রধান সড়কে ইজিবাইক চলাচল নিষিদ্ধ করতে হবে।

৭. জরুরিভিত্তিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও যন্ত্রাংশ আমদানি বন্ধ করতে হবে।

৮. ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে প্রতিটি এলাকার নিবন্ধন প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ ও যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতামত এবং যাত্রীদের সঙ্গে গণশুনানি করে এলাকাভিত্তিক ভাড়া নির্ধারণ করে দিতে হবে।

© 2026 republicdhaka.com | About us | Privacy Policy | Terms & Condidtion
Developed by- SHUMANBD.COM