নিউজ ডেস্ক: একসময় অতি বিপদে না পড়লে পাবলিক টয়লেটে যেতেন না সাধারণ মানুষ। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি পাল্টেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ওয়াটারএইড বাংলাদেশ ৩৪টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করে। এসব টয়লেটের চেহারা একেবারেই ভিন্ন। দেয়াল, মেঝে ঝকঝকে। মাথার ওপরে বৈদ্যুতিক পাখা। প্রতিটি গণশৌচাগারে নারী, পুরুষ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা কক্ষ, ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ, টিস্যু পেপার, হ্যান্ডওয়াশ, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গোসলের ব্যবস্থা রয়েছে। আছে শৌচাগার ব্যবহারকারীদের জন্য লকার। বাইরে সিসি ক্যামেরা। শিশুদের দুধ খাওয়ানো এবং ডায়াপার পরিবর্তনের জন্যও রয়েছে আলাদা স্থান। এসব টয়লেটের পরিচ্ছন্নতায় রয়েছেন পেশাদার পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নারী নিরাপত্তাকর্মী। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন থেকে এসব পাবলিক টয়লেটও এখন বেহাত।
ইতোমধ্যে ওয়াটারএইডের দুটি পাবলিক টয়লেট দখল করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা পরিচয়ে একজন। রাজধানীর বাকি টয়লেটগুলোও দখলে নিতে ছাত্রদল পরিচয়ে কিছু লোক হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।
চট্টগ্রামে ওয়াটারএইডের পাবলিক টয়লেট দখল করতে তৎপর বিএনপিপন্থি এক ঠিকাদার। পাবনার ঈশ্বরদীতে পাবলিক টয়লেটের একটি কক্ষ দখলে নিয়ে স্থানীয় বিএনপি অফিস বানিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে টয়লেট রক্ষায় ওয়াটারএইড কর্তৃপক্ষ থানা ও সিটি করপোরেশনে অভিযোগ করলেও কোনো সুরাহা হয়নি। উল্টো হুমকি ও আতঙ্কে আছেন মাঠ পর্যায়ে টয়লেট পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মীরা।
বাকিগুলোও দখলের হুমকি
ওয়াটারএইড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ৩৪টি পাবলিক টয়লেট স্থানীয় বিভিন্ন এনজিও পরিচালনা করে। একেকটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৬০-৭০ লাখ টাকা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১২টি, দক্ষিণ সিটি এলাকায় ১১টি, চট্টগ্রাম সিটিতে ৮টি, ঈশ্বরদী ও পঞ্চগড় রেলস্টেশন এবং রাজশাহী সিটিতে একটি করে টয়লেট আছে। গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা ও চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি টয়লেটে হামলা চালানো হয়। এ সময় সব মাল খুলে নিয়ে যায় তারা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আজমপুর ও মিরপুর ১২ নম্বরে তিনটি এবং চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড়, লালদীঘির পাড় ও নতুন রাস্তা ব্রিজসংলগ্ন পাবলিক টয়লেটে হামলা করা হয়।
রাজধানীর গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টসংলগ্ন মুক্তাঙ্গন পাবলিক টয়লেট এবং পীর ইয়ামেনী মার্কেটসংলগ্ন ওসমানী উদ্যানের পাবলিক টয়লেটটি পরিচালনা করত বেসরকারি সংস্থা সাজেদা ফাউন্ডেশন। সম্প্রতি টয়লেট দুটি দখল করে নেন মো. রাজীব নামে এক ব্যক্তি। গত রোববার দুটি টয়লেটে সরেজমিন দেখা গেছে, জনপ্রতি ১০ টাকার বিনিময়ে টয়লেটে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে। টয়লেট পরিচালনায় থাকা দু’জন নিজের নাম প্রকাশ করতে রাজি না হলেও বলেন, দখলদার রাজীব ছাত্র আন্দোলন করেন। তিনিই এসব টয়লেট দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছেন।
অবশ্য রাজীবের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে তাঁর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইলে তাঁর ছবির পেছনে গণঅধিকার পরিষদের একটি সাইনবোর্ড রয়েছে। বিষয়টি অস্বীকার করে রাজীব বলেন, আমি ওয়াটারএইডের সঙ্গে যোগাযোগ করব– তারা কেন আমার নামে অভিযোগ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়াটারএইডের এক কর্মকর্তা বলেন, রাজীবই আমাদের দুটি টয়লেট দখল করেছেন। তিনি একেকবার একেক রকম পরিচয় দিয়েছেন। কখনও বলেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কখনও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, আবার কখনও গণঅধিকার পরিষদ নেতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁকে বারবার অনুরোধ করার পরও দখল ছাড়ছেন না।
টয়লেট দুটি উদ্ধারে সহায়তা চেয়ে গত ২০ আগস্ট ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে চিঠি দিয়েছেন সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক সালমা আহমেদ। এর আগে ১২ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা ও ১৯ আগস্ট ওয়াটারএইডের প্রতিনিধি দল সিটি করপোরেশনে গিয়ে বিষয়টি অবহিত করে। তার পরও টয়লেট দুটি উদ্ধার না হওয়ায় ওয়াটারএইড শাহবাগ ও পল্টন থানায় সাধারণ ডায়েরি করে। স্থানীয় সেনাবাহিনীর ক্যাম্পেও দেওয়া হয় অভিযোগ। কিন্তু এখনও উদ্ধার হয়নি টয়লেট দুটি।
এদিকে রাজধানীর অন্য টয়লেটগুলোও দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি চক্র। বিভিন্ন টয়লেটে গিয়ে কর্মীদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। মির্জা শাকিল নামের এক ব্যক্তি নিজেকে উত্তরার আজমপুর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিয়ে এবং নাহিদ নামের একজন নিজেকে গুলশান ছাত্রদলের সভাপতি পরিচয় দিয়ে টয়লেট দখলের হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তারা ওয়াটারএইডের কার্যালয়ে গিয়েও কর্মকর্তাদের টয়লেট বুঝিয়ে দিতে হুমকি দিয়ে এসেছে। তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত নাহিদ ও শাকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তাদের বিষয়ে জানতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসিরকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, এই নামে ছাত্রদলের কাউকে চিনি না। ছাত্রদল পরিচয়ে কেউ এমন কোনো অপকর্ম করলে তাদের বেঁধে রেখে আমাকে খবর দেবেন। এ রকম অন্যায় ছাত্রদল প্রতিহত করবে।
চট্টগ্রামে মরিয়া বিএনপিপন্থি ঠিকাদার
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় ওয়াটারএইড আটটি আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করে। এসব টয়লেট পরিচালনা করে দুস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র (ডিএসকে)। চুক্তি অনুযায়ী গণশৌচাগারগুলোর আয় থেকে প্রতি অর্থবছরে সাত লাখ টাকা পাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। কিন্তু সম্প্রতি গণশৌচাগারগুলো দখলের চেষ্টা করছেন সালামত আলী নামে এক বিএনপিপন্থি ঠিকাদার। এ ছাড়া নগরের কর্ণফুলী সেতু সংযোগ সড়ক ও লালদীঘির পাড় গণশৌচাগারে ভাঙচুর করা হয়। এতে প্রায় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। অক্সিজেন মোড়ের গণশৌচাগারের সরঞ্জাম লুট করা হয়। এর পর থেকে এটি বন্ধ।
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আবদুল্লাহ আল ওমর বলেন, গণশৌচাগারগুলো পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় নির্মাণ করেছিল ওয়াটারএইড। এগুলো পরিচালনার জন্য তাদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের পাঁচ বছরের চুক্তি হয়েছে। চুক্তির মেয়াদ আরও তিন বছর রয়েছে। ওয়াটারএইড ও ডিএসকে নিয়মিত রাজস্ব আদায় করে।
সালামত আলীর কোনো পদ-পদবি আছে কিনা, তা বিএনপির কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে গত ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম সিটির বিএনপিপন্থি ঠিকাদাররা নতুন সমিতি গঠন করেন। তাতে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে আছেন সালামত আলী। অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে একাধিকবার তাঁর মোবাইলে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এ ছাড়া পাবনার ঈশ্বরদী রেলস্টেশন এলাকায় ওয়াটারএইডের পাবলিক টয়লেটটি দখলে নিতে একটি গ্রুপ হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। টয়লেটটির পাশের একটি কক্ষ দখলে নিয়ে বিএনপি পরিচয়ে কিছু ব্যক্তি সেখানে চেয়ার পেতে আড্ডা দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর সামনে বিএনপির একটি ফেস্টুনও লাগানো হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর কে এ আমিন বলেন, সিটি করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে মানুষের দুর্ভোগ মেটাতেই এসব শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে। গণশৌচাগারে টিকিট বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থে পরিচালনার ব্যয় মেটানো হয়। পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে ওয়াটারএইডের তহবিল থেকেও দেওয়া হয়।
সূত্র: সমকাল
এমএফ