নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘আমার নিজ হাতে তৈরি ঠাকুরের পায়ে মানুষ অঞ্জলি দিচ্ছে, এটা যখন দেখি তখন যে ভালো লাগার অনুভূতি হয় ভেতরে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না।’ গত বুধবার নিজের তৈরি দুর্গা প্রতিমা নিয়ে হাসিমুখে এ কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর শাঁখারীবাজারের নারী প্রতিমাশিল্পী অনামিকা নন্দী। তাঁর হাতের শিল্পিত কারুকাজে যেন এক একটি দেবী প্রতিমায় সত্যি প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
যে কোনো পূজা এলেই দেবী প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ততা বাড়ে প্রতিমা কারিগরদের। রাত-দিন পরিশ্রমে তারা নিপুণ শিল্পীর দক্ষতায় গড়ে তোলেন এক একটি মায়াময় প্রতিমা। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণত পুরুষরাই প্রতিমা শিল্পীর কাজ করতেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এখন অনামিকার মতো অনেক মেয়ে প্রতিমাশিল্পীও এগিয়ে এসেছেন এই কাজে।
অনামিকা জানান, তাঁর বাড়ি নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ। ঢাকা মহানগর কলেজে এমবিএ করছেন। বাবা সুশীল নন্দী ও মা সুজলা নন্দীর একমাত্র সন্তান তিনি। বাবা নিজেও ছিলেন প্রতিমাশিল্পী। সুশীল নন্দী আড়াই বছর আগে মহাদেবের একটি প্রতিমা অর্ধেক তৈরি রেখে হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা যান। যারা প্রতিমাটির কাজ দিয়েছিলেন তারা তখন অনামিকাকে এটি শেষ করে দিতে বলেন। সেই থেকে শুরু অনামিকার প্রতিমা তৈরির কাজ। আজ বাবার দেখানো পথ বেয়ে তিনিও পেশাদার প্রতিমাশিল্পী হয়েছেন।
অনামিকা জানান, লাঙ্গলবন্দে তাদের পৈতৃক বাড়িটি দখল করে রেখেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। ওই বাড়ির দলিলসহ সম্পর্কিত কাগজপত্র সবকিছুই আছে। এটি তাঁর বাবা-দাদার কেনা দেবোত্তর সম্পত্তি। বাবা সুশীল নন্দী এই সম্পত্তি দখলমুক্ত করতে পারেননি। বাবার মৃত্যুর পর এই সম্পত্তি উদ্ধার নিয়ে তাঁকেও নানা ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। তবে এখন পড়ালেখার জন্য সম্পত্তি উদ্ধারে ছোটাছুটি আপাতত বন্ধ রেখেছেন। পড়ালেখা শেষ হলে আবার সম্পত্তি ফিরে পেতে লড়বেন।
জানা গেল, শাঁখারীবাজারে নবীন-প্রবীণ অনেক প্রতিমা কারিগরের ভিড়ে অনামিকা এ বছর দুটি প্রতিমা তৈরি করেছেন। তাঁর তৈরি একটি প্রতিমা গেছে যাত্রাবাড়ী কালীমন্দিরে। অন্য প্রতিমাটি নারিন্দায় ব্যক্তিগত পূজার কাজে এক ব্যক্তি নিয়েছেন।
অনামিকা জানান, লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রতিমা তৈরি ও টিউশনি করেই তাঁর সংসার চলে। মাসহ থাকেন তাঁতীবাজার। শাঁখারীবাজারে তাঁর দোকান থাকলেও কোনো সাইনবোর্ড নেই। যদিও শাঁখারীবাজারে অনামিকার নাম বললেই চিনতে পারে লোকেরা। সংসারের কাজ, লেখাপড়া ও টিউশনি করিয়ে বাকি যেটুকু অবসর পান, সে সময় কাজে লাগান প্রতিমা তৈরিতে। তাঁর দোকানে শুধু দুর্গা নয়, ছোট-বড় অন্যান্য দেব-দেবীর প্রতিমাও তৈরি হয়।
এই পেশায় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে উল্লেখ করে অনামিকা বলেন, খরিদদাররা আগে মনে করত, আমি মেয়ে, প্রতিমা বানাতে পারব কিনা! তারা সংশয় বোধ করত অর্ডার দিতে। তবে এখন আমার কাজ দেখে বিশ্বস্ততা তৈরি হয়েছে। কাজও বেড়েছে। যদিও অন্যান্য কারিগর থেকে তেমন সহযোগিতা না পেলেও শাঁখারীবাজারের সবচেয়ে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ কারিগর হরিপদ জেঠুর কাছ থেকে পরামর্শ নেই। কারণ আমার এখনও অনেক কিছু শেখার বাকি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে অনামিকা বলেন, পড়ালেখা শেষ করে চাকরিতে ঢুকলেও প্রতিমা তৈরির কাজটা চালিয়ে যাব।